বুধবার, ২৫ জুলাই, ২০১২

চেয়ার থেকে পড়ে গিয়েই হুমায়ূনের বড় বিপত্তি ঘটে!

দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের ধকল হুমায়ূন আহমেদ সামলে উঠতে পারেননি। আর এই দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের নেপথ্যে রয়েছে একটি দুঃখজনক দুর্ঘটনা। সুস্থ হয়ে উঠতে থাকা হুমায়ূন ২০ জুন বসার চেয়ার থেকে মেঝেতে পড়ে যান। হুমায়ূনের সার্ব-ক্ষণিক সঙ্গীরা সমস্যার গুরুত্ব তত্ক্ষণাত্ বুঝে উঠতে না পারায় ঘটে মারাত্মক বিপত্তি। তাকে জরুরিভিত্তিতে নেয়া হয়নি হাসপাতালে। পরে হুমায়ূনের ব্যথা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেলে জ্যামাইকা হাসপাতালে নেয়া হলেও ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। অনিবার্য হয়ে পড়ে অতি ঝুঁকিপূর্ণ দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার। এই অস্ত্রোপচারই তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই অস্ত্রোপচারের পরই তিনি ধীরে ধীরে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন, অব-চেতনের অতলে তলিয়ে গেছেন, যেখান থেকে তিনি আর ফিরে আসেননি।
দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার মানে শরীরের নতুন কোনো স্থানে কাটা-ছেঁড়া নয়। প্রথম অস্ত্রোপচারের জায়গাটিই আবার কেটে-খুলে দেখা হয়েছে ভেতরের সমস্যা। খুঁজে
বের করা হয়েছে তার অবস্থার আকস্মিক অবনতির কারণ। দেখা হয়েছে ভেতরে অস্ত্রোপচারের স্থানে তার অসহনীয় ব্যথার কারণ কী। হুমায়ূন আহমেদের ভাই ড. জাফর ইকবাল, যিনি শেষ সময়ে হুমায়ূনের কাছে ছিলেন, ঢাকায় ফিরে বলেছেন, ক্যান্সার হুমায়ূনের মৃত্যুর কারণ নয়। ভেতরে অস্ত্রোপচারের স্থানে ইনফেকশন বা সংক্রমণে তার মৃত্যু হয়েছে।
এ সম্পর্কে অস্ত্রোপচারকারী ডাক্তারদের বা বেলভিউ হাসপাতালের রিপোর্ট দেখার সুযোগ আমার হয়নি। তবে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, ভেতরে কাটাকুটির পর অস্ত্রোপচারের স্থানটি জোড়া লাগানোর জন্য যে সেলাই দেয়া হয়েছিল, সেই সেলাই খুলে যাওয়াতেই নাকি বিপত্তিটা ঘটেছে।
কিন্তু বিপত্তিটা ঘটল কেন? সেলাই খুলে গেল কেন? অস্ত্রোপচারের দশ দিন পর এ ধরনের কিছু ঘটাকে কি স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়া যায়? অস্ত্রোপচারের পর তো তিনি ভালোই ছিলেন। ১২ জুন তার অস্ত্রোপচার হয়েছে। পুরো এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিত্সকরা তাকে ১৯ জুন রিলিজ করে দেন। সেদিনই তিনি বাসায় ফিরে আসেন। নিউইয়র্কের বাংলা পত্রিকাগুলো খবর দেয় তার অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে। তিনি ভালো আছেন।
এই ভালো থেকে দশ দিন পর ২১ জুন হঠাত্ কেন খারাপ হয়ে গেল তার অবস্থা? কেন তার আবার দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলো? মনে করা হচ্ছে, একটি দুর্ঘটনা তার অবস্থার অবনতির কারণ। দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল ২০ জুন বিকালে। হুমায়ূন তার বসার চেয়ার থেকে ঘরের মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলেন। তার এই পড়ে যাওয়ার বিপজ্জনক দিকটি বোধহয় তার স্ত্রী শাওন ও তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী প্রকাশক মজহারুল ইসলাম বুঝে উঠতে পারেননি। তখন থেকেই হুমায়ূনের ব্যথা শুরু হলেও তাকে তাত্ক্ষণিকভাবে হাসপাতালে নেয়া হয়নি বা জরুরি চিকিত্সা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়নি। রাতে তার অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে এবং পরদিন সকালে ব্যথা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেলে মজহারুল ইসলাম অ্যাম্বুলেন্স ডেকে তাকে কাছের জ্যামাইকা হাসপাতালে নিয়ে যান এবং নিউইয়র্কে হুমায়ূন আহমেদের চিকিত্সার সার্বিক তত্ত্বাবধানকারী মুক্তধারার বিশ্বজিত্ সাহাকে বিষয়টি জানান। বিশ্বজিত্ দ্রুত জ্যামাইকা হাসপাতালে ছুটে গিয়ে হুমায়ূনকে তার অস্ত্রোপচারকারী হাসপাতাল লোয়ার ম্যানহাটানের বেলভিউতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।
এখানে পরদিনই ২২ জুন জরুরিভিত্তিতে সম্পন্ন হয় তার দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার। শুনেছি, তার অবস্থার অবনতি এবং অসহ্য ব্যথার কারণ খুঁজতে গিয়ে চিকিত্সকরা দেখেছেন খুলে যাওয়া সেলাই এবং সেখান থেকে রক্তক্ষরণ। একথা অবধারিত যে, অস্ত্রোপচার স্থানের সেলাই খুলে যাওয়া, সেখান থেকে রক্তক্ষরণ এবং সংক্রমণ—এসবই ঘটেছে তার পড়ে যাওয়ার কারণে।
নন্দিত ও জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের এমন অপ্রত্যাশিত মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটিতে। সৃষ্টি হয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার। এখানকার বাংলা পত্রপত্রিকাগুলো হয়ে উঠেছে সমালোচনামুখর। হুমায়ূনের পড়ে যাওয়ার ঘটনাটি এখন আর কারও অজানা নেই। সবার মধ্যে সাধারণভাবে ধারণা জন্মেছে যে, পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যদি তাকে হাসপাতালে নেয়া হতো, উপযুক্ত চিকিত্সার ব্যবস্থা করা হতো তাহলে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্নতর হতো। প্রথম অস্ত্রোপচারের পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাসায় ফিরে হুমায়ূন যথাযথ সেবা-শুশ্রূষা থেকে বঞ্চিত ছিলেন—এমন অভিযোগ এখন বিরাজ করছে প্রবাসীদের মধ্যে।amardesh