বুধবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১২

তোমার চোখ তুলে ফেলবো! তুমি আমাকে চেনো না? হারামজাদা কোথাকার!

মহেশপুরনিউজ২৪::
যেন চলচ্চিত্রের কোন দৃশ্য! চেয়ার থেকে উঠে মন্ত্রী মহোদয় তেড়ে গেলেন প্রতিপক্ষ দলের নেতার দিকে। বললেন, তোমার চোখ তুলে ফেলবো! তুমি আমাকে চেনো না? হারামজাদা কোথাকার! তোমাকে আজ জুতাপেটা করবো। অকস্মাৎ এই ঘটনায় অনুষ্ঠানের অন্য সব অতিথি-আলোচকরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। হতভম্ব হয়ে তারা তাকিয়ে তাকিয়ে কেবল দেখছিলেন শ্বাসরুদ্ধকর সেই দৃশ্য।অবিশ্বাস্য এই ঘটনা ঘটেছে গত সোমবার মধ্যরাতে বেসরকারি টেলিভিশন আরটিভি আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায়। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সমপ্রচার করা হচ্ছিল। তবে ভাষার ব্যবহার শালীনতার সীমা অতিক্রম করার এক পর্যায়ে কর্তৃপক্ষ তড়িঘরি সরাসরি সমপ্রচার বন্ধ করে দেয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আরটিভির নিয়মিত মধ্যরাতের টক শো ‘আওয়ার ডেমোক্রেসি’র স্লটেই সোমবার মধ্যরাতে কিছুটা বৃহৎ পরিসরে আয়োজন করা হয় ‘ঈদ-পূজায় নিরাপদে ঘরে ফেরা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা। এটি অনুষ্ঠিত হয় তেজগাঁও শিল্প এলাকায় আরটিভির নবনির্মিত বহুমাত্রিক স্টুডিও হলে। এতে অতিথি হিসেবে অংশ নেন নৌপরিবহনমন্ত্রী মো. শাহজাহান খান, বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি মো. ইসরাফিল আলম, আওয়ামী লীগের আরেক এমপি গোলাম মওলা রনি, বিএনপি দলীয় এমপি রাশেদা বেগম হিরা, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সভাপতি চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন, জাতীয় পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, র‌্যাবের পরিচালক কমান্ডার এম সোহায়েল, পরিবেশ আন্দোলনের নেতা স্থপতি ইকবাল হাবিব, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনির হায়দার, সাংবাদিক জাকারিয়া কাজল এবং প্রবাসী সাংবাদিক নিশাদ দস্তগীর। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন ঢাবি শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস।
রাত সোয়া ১১টা থেকে আরটিভিতে সরাসরি সমপ্রচার শুরু হওয়ার পর যত দূর দেখা গেছে- আলোচনার এক পর্যায়ে বক্তব্য শুরু করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী মো. শাহজাহান খান। তিনি নৌপথের উন্নয়নে তার সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের বয়ান দেন। বিশেষত, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতায় নতুন নতুন জাহাজ ক্রয়, ড্রেজার ক্রয় ইত্যাদির বিবরণ তুলে ধরেন তিনি। একপর্যায়ে তিনি বলেন, বিগত জোট সরকারের আমলে নৌপরিবহন খাতের কোন উন্নয়ন হয়নি। তখন কেবল চাঁদাবাজি আর দুর্নীতি হয়েছে এই খাতে। মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় টার্মিনালে চাঁদাবাজি করেছে। তার এই বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়ে এ সময় বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, আমাদের সময় দুর্নীতি আর চাঁদাবাজি হয়েছে, এখন কি এসব বন্ধ হয়ে গেছে? সে সময় বেশি চাঁদাবাজি হয়েছে, নাকি এখন বেশি হচ্ছে- সেই হিসাব দেন। এখন তো লোকজন আপনাদের চোর বলছে। এ সময় শাহজাহান খান কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলেন, আপনি চুপ করুন। আমার বলা শেষ হলে আপনি বলবেন। জবাবে রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, এই অনুষ্ঠানে আমাকে দাওয়াত দেয়ার সময় বলা হয়েছিল যে, কোন রকম আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেয়া হবে না। কিন্তু এখন দেখছি শুধু আমাদের আমলের বদনাম করা হচ্ছে। এ পর্যায়ে উপস্থাপক বলেন, জনাব রফিকুল ইসলাম মিয়া আপনাকে বলার সুযোগ দেয়া হবে, আপনি তখন বলবেন। কিন্তু তাতে কর্ণপাত না করে তিনি শাহজাহান খানের কথার পিঠে কথা বলে যাচ্ছিলেন। আর এতেই প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন নৌপরিবহনমন্ত্রী। আপনি থেকে হঠাৎ তুমি সম্বোধন শুরু করেন তিনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় হঠাৎ বন্ধ করে দেয়া হয় সরাসরি সমপ্রচার। কিন্তু তাতেও থামছিলেন না দুই নেতা। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান দু’জনেই। শাহজাহান খান হুঙ্কার দিয়ে বলে ওঠেন, হারামজাদা তুমি জানো না একজন মন্ত্রীর সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয়? তোমাকে আজ জুতাপেটা করবো। মন্ত্রীর এসব কথায় একেবারেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান রফিকুল ইসলাম মিয়া। তিনি মাথা নিচু করে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন স্টুডিও থেকে। এ সময় তার দিকে তেড়ে যান মন্ত্রী শাহজাহান খান। বলে ওঠেন, রফিক তুমি শাহজাহান খানকে চেনো না। আজ এখন তোমার চোখ তুলে ফেলবো। মারামারি করতে চাইলে চলো ফিল্ডে নামি। এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি ইসরাফিল আলম-ও নৌমন্ত্রীর পক্ষ নিয়ে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াকে বকাঝকা করতে থাকেন। তবে বাকি সবাই হতভম্ব হয়ে নীরবে দেখতে থাকেন সেই দৃশ্য। এমনকি অপর দুই এমপি গোলাম মওলা রনি এবং রাশেদা বেগম হিরাও নিজ নিজ আসনে বসেছিলেন চুপচাপ। একপর্যায়ে রফিকুল ইসলাম মিয়া স্টুডিও থেকে বেরিয়ে যান। উঠে দাঁড়ান ইলিয়াস কাঞ্চন, মনির হায়দার ও ইকবাল হাবিব। কিন্তু আরটিভির স্টাফদের অনুরোধে তারা আবার চেয়ারে বসেন। এ পর্যায়ে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হিরা চেয়ার থেকে উঠে বেরিয়ে যান। এ সময় আওয়ামী লীগের এমপি ইসরাফিল আলম তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি আবার কোথায় যাচ্ছেন? জবাবে রাশেদা বেগম হিরা বলেন, আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছি। তাই আর বসতে চাই না। পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে ইসরাফিল আলম বলেন, আপনাদের আবার ভয় আছে নাকি? কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, আরটিভির কর্মকর্তারা ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া ও রাশেদা বেগম হিরাকে আবার স্টুডিওতে ফিরিয়ে এনেছেন। তাদের অংশগ্রহণেই কয়েক মিনিট পর আবার শুরু হয় অনুষ্ঠানটি এবং সরাসরি সমপ্রচার করা হয় বাকি অংশ। শেষ অংশের আলোচনায় আর তেমন উত্তাপ-উত্তেজনা ছিল না। অবশ্য অনুষ্ঠান শেষে আরটিভি কর্মীদের অনুরোধে মন্ত্রী শাহজাহান খান স্টুডিও থেকে বের হওয়ার পথে হাত মেলান ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার সঙ্গে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া জানান, আমি হতবাক হয়েছি। কোন সভ্য মানুষ এ ধরনের ভাষায় কথা বলতে পারেন এটা বিশ্বাস হচ্ছে না। একজন মন্ত্রী হয়ে প্রকাশ্যে কোন নাগরিককে যে ধরনের ভাষায় হুমকি দেয়া হয়েছে তা বলতে লজ্জা হচ্ছে। রাজনীতি করতে গিয়ে মানুষকে শ্রদ্ধা করতে শিখেছি। অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য, সাংবাদিক ও র‌্যাবের একজন ডিজি ছিলেন। তাদের সামনেই কাউকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া কোন সভ্য মানুষের পরিচয় হতে পারে না।